#কলমের #কালিতে #লেখা #জীবন
গ্রামের নাম ছিল শালবনপুর। খুব বড় গ্রাম নয়, আবার খুব ছোটও নয়। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিল ছেলেটি—নাম তার রাশেদ। জন্মের পর থেকেই অভাব যেন তার সঙ্গে লেগেই ছিল। মাটির ঘর, টিনের চাল, বর্ষাকালে চুইয়ে পড়া পানি—এসবই ছিল তার শৈশবের চেনা দৃশ্য।
রাশেদের বাবা, আব্দুল করিম, ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। বেতন অল্প, কিন্তু সম্মান ছিল অগাধ। গ্রামে কেউ কোনো চিঠি লিখতে পারত না, দরখাস্ত করতে পারত না—সবাই ছুটে যেত করিম মাস্টারের কাছে। তিনি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না।
করিম মাস্টারের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল একটি পুরোনো কলম। কালো রঙের, একটু বাঁকা নিভ, বহুদিনের ব্যবহারে রঙ উঠে গেছে। এই কলম দিয়েই তিনি ছাত্রদের পড়াতেন, দরখাস্ত লিখতেন, আবার রাতে বসে নিজের ডায়েরিতে কিছু না কিছু লিখতেন।
একদিন ছোট রাশেদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“আব্বা, এই কলমটা তুমি এত যত্ন করে রাখো কেন?”
বাবা মৃদু হেসে বলেছিলেন,
—“বাবা, এই কলম দিয়েই আমি মানুষ গড়ি। টাকার জোরে নয়, কলমের জোরেই দুনিয়া বদলায়।”
তখন রাশেদ এসব কথা ভালো করে বুঝত না। তার চোখে তখন কলম মানে শুধু লেখার জিনিস। কিন্তু বাবার চোখে কলম ছিল শক্তি, অস্ত্র, আলো।
সময় গড়িয়ে গেল। রাশেদ বড় হতে লাগল। পড়াশোনায় সে খুব মেধাবী ছিল না, আবার খারাপও না। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনায় মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ল। অনেক সময় খালি পেটে স্কুলে যেতে হতো। বন্ধুদের নতুন ব্যাগ, নতুন জুতো দেখে তার মনে হতো—এই জীবন বুঝি শুধু কষ্টের জন্যই লেখা।
হঠাৎ একদিন করিম মাস্টার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রামের ডাক্তার বললেন, শহরে নিতে হবে। কিন্তু শহরের চিকিৎসা মানেই অনেক টাকা। সেই টাকা তাদের ছিল না। ধারদেনা করেও বেশি দূর এগোনো গেল না।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই করিম মাস্টার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
বাবার মৃত্যু রাশেদের জীবনে যেন সব আলো নিভিয়ে দিল। সংসারে রোজগার করার কেউ রইল না। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। মাকে আর ছোট বোনকে বাঁচানোর দায়িত্ব পড়ল তার কাঁধে।
সে কাজ নিল নির্মাণস্থলে। রোদে পুড়ে, ইট বয়ে দিন কাটাতে লাগল। সন্ধ্যায় আবার চা-দোকানে কাজ। ক্লান্ত শরীর, ফাটা হাত—তবু সে অভিযোগ করত না।
একদিন মায়ের হাতে বাবার জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে রাশেদ সেই পুরোনো কলমটি খুঁজে পেল। কলমটি হাতে নিয়ে তার চোখ ভিজে উঠল। বাবার গন্ধ, বাবার স্মৃতি—সব যেন কলমের সঙ্গে মিশে ছিল।
সেই রাত থেকেই রাশেদ নতুন করে কলম ধরল। পুরোনো খাতার পেছনের পাতায় সে লিখতে শুরু করল—নিজের জীবনের কথা, কষ্টের কথা, বাবার কথা, গ্রামের মানুষের কথা। সে জানত না সে ভালো লেখে কি না, শুধু জানত লিখলে মন হালকা হয়।
দিনের পর দিন এভাবেই চলতে লাগল। একদিন চা-দোকানে বসে সে খবরের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন দেখল—
“জাতীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতা
বিষয়: কলম ও জীবন
প্রথম পুরস্কার: শিক্ষাবৃত্তি ও নগর কলেজে ভর্তির সুযোগ”
রাশেদের বুক ধড়ফড় করে উঠল। তার মতো একজন শ্রমিক, যার পড়াশোনাই অসম্পূর্ণ—সে কি এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে?
সারারাত সে ঘুমাতে পারল না। বাবার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল—
“কলম কখনো গরিব হয় না।”
পরদিন কাজ শেষে সে কলম আর খাতা নিয়ে বসে পড়ল। বিদ্যুৎ ছিল না। কুপির ক্ষীণ আলোতে সে লেখা শুরু করল। লিখল নিজের জীবনের গল্প, বাবার আদর্শ, কলমের শক্তি, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলমের প্রতিবাদ।
লেখার মাঝে মাঝে তার চোখে জল আসছিল। কলমের কালি ফুরিয়ে আসছিল, কিন্তু সে থামেনি। মনে হচ্ছিল—এই কলমের ভেতর দিয়ে বাবাই যেন তার হাত ধরে লিখছেন।
তিন রাত, চার রাত—শেষমেশ লেখা শেষ হলো।
সে লেখা পাঠিয়ে দিল। এরপর শুরু হলো অপেক্ষা। প্রতিদিন ডাকপিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকত রাশেদ। মনে মনে ভাবত—হয়তো কিছুই হবে না, তবু চেষ্টা তো করেছিল।
একদিন দুপুরে ডাকপিয়ন এসে একটি খাম দিল। খাম খুলে পড়তেই রাশেদের চোখ ছলছল করে উঠল।
সে জাতীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
গ্রাম যেন উৎসবে মেতে উঠল। সবাই অবাক—একজন শ্রমিক, অথচ দেশের সেরা লেখা! সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলো—
“কলম বদলে দিল এক গরিব ছেলের জীবন”
রাশেদ শহরে পড়তে গেল। ধীরে ধীরে সে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক হয়ে উঠল। তার লেখায় উঠে আসত গ্রামের কথা, শ্রমিকের কষ্ট, শিক্ষার আলো।
আজ বহু বছর পর, বড় এক সাহিত্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে রাশেদ। বক্তৃতার শেষে সে পকেট থেকে বের করল সেই পুরোনো কলমটি।
সে বলল,
—“এই কলম আমাকে শুধু লেখক বানায়নি, মানুষ বানিয়েছে। কলম যদি সঠিক হাতে থাকে, তবে সে ভাগ্যও বদলাতে পারে।”
হলভর্তি মানুষ দাঁড়িয়ে করতালি দিল।
কলমটি আজও পুরোনো, নিভ একটু বাঁকা—
কিন্তু তার কালিতে লেখা আছে এক জীবনের ইতিহাস।