একটি গালাগালির ব্যক্তিগত কবিতা
- কাজী অ্যাডাম

শেয়ার করুন

প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন এক শুয়োর বলেছিল—

তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় আমাকে পেলে

বার্নিশ করে ছেড়ে দেবে।

 

তারপর তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে

এমনকি উঠোন দিয়েও

কত হেঁটে গেলাম—

আজও তার দেখা পেলাম না।

 

যদিও আজকাল

তাদের উঠোন দিয়ে যাওয়া যায় না,

চারপাশে দেয়াল দেওয়া।

 

শুয়োরটা হয়তো বুড়ো হয়েছে,

অথবা হুমকি দেওয়ার বয়স পেরিয়ে

নিজের দেয়ালের ভেতরেই

বন্দি হয়ে গেছে।

 

ক্লাস নাইনে পড়ার সময়

এক সিনাল প্রেমিকা বলেছিল—

“তোমাকে ছেড়ে কখনো যাব না।”

 

সে-ও গেল।

তারপর তার আর দেখা পেলাম না।

 

এখন জানি না

সে কার ঘর করছে,

কার সংসারে তার উদোম

শরীরের সকাল হয়,

কার পাশে শুয়ে

একদিনের সেই কথাটাকে

চিরতরে ভুলে গেছে।

 

অবশ্য তার ঠোঁটের সেই চুমু

এখনও ঠোঁটে লেগে আছে।

 

একটি চুমু

মানুষের চেয়েও কেন দীর্ঘজীবী হয়—

এই অপরাধের কোনো বিচার

আজও আমি চাইনি।

 

ইন্টারে পড়ার সময়

এক ভুস্কির সঙ্গে প্রেম হয়েছিল।

 

সেও বলেছিল—

আমি তার প্রথম ও শেষ।

 

প্রথম কথাটা শুনে

নিজেকে বিশেষ ভেবেছিলাম,

শেষ কথাটা শুনে

নিজেকে অমর।

 

দুটোই ভুল ছিল।

 

সে-ও কোন নাগরের ঘরে গেছে

তা জানি না।

 

জানার চেষ্টাও করিনি—

কিছু কিছু মানুষের বর্তমান জানলে

নিজের অতীতটাকেই

বেশ্যা মনে হয়।

 

অনার্সে পড়াকালে

এক খ্রিস্টান রমণীর সঙ্গে

গভীর প্রণয় হয়েছিল।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে

সেও চলে গেল তার দেশে।

 

এখন না জানি সে

কোন আবালের বিছানায়

সুখ বিলায়।

 

ক্যারিয়ারের প্রথমে

যে মেয়েটির সঙ্গে

অসম প্রেমে মজেছিলাম,

সে অবশ্য থাকার চেষ্টা করেছে অনেক।

 

অনেক।

 

সে-ই ছিল সবচেয়ে বড় প্রমাণ

যে আমি সবসময় পরিত্যক্ত ছিলাম না।

কিন্তু আমি তো ছিলাম কুত্তা—

যার পেটে ঘি হজম হয়নি।

 

মানুষ কখনও কখনও

যে মানুষটাকে হারিয়ে কাঁদে

তাকে হারানোর আগে

নিজেই তার কবর খুঁড়ে রাখে।

 

তারও বছর কয়েক পর

ঢাকার এক শহুরে মাগির সঙ্গে প্রেম হয়েছিল।

 

এখন বুঝেছি—

সেটা ছিল তার ভাষায়

“সিচ্যুয়েশনশিপ”।

 

আমি ভেবেছিলাম

তাকে নিয়েই বাকি জীবন কেটে যাবে।

 

তারপর সেও চলে গেল

তার আগের ভাতারের কাছে।

 

তার আগের ভাতার—

কামলা দিতো কাতার।

 

আমি তার ছুঁয়েছিলাম সব,

যদিও সে নিজেকে দাবি করে

প্রেমে ভার্জিন।

 

তার লাং জানেই না—

তার প্রিয়তমা বউয়ের জমিনে

আমার চাষাবাদ করা হয়ে গেছে।

 

তাদেরও দেখি ফেসবুকে পোস্ট করতে—

“আমাদের দীর্ঘ পবিত্র প্রেমের দাম্পত্য জীবন।”

 

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি।

 

হাসিও পায়,

গালিও আসে।

 

অথচ সেই প্রেমে

আমি সিলগালা করেছি

অনেক আগেই।

 

কত বাঞ্চুদের সঙ্গে দেখা হলো—

কতজন কত হুমকি দিল।

 

কেউ বলল দেখে নেবে,

কেউ বলল ছেড়ে দেবে না,

কেউ আমার সামনে দাঁড়িয়ে

নিজের প্রেমের বিজ্ঞাপন দিল।

 

আজকাল তাদের কথা মনে পড়ে।

তবুও তাদের দেখা পাওয়া যায় না।

 

শুয়োরটা নেই,

সিনাল প্রেমিকা নেই,

ভুস্কি নেই,

খ্রিস্টান রমণী নেই,

অসম প্রেমের সেই মেয়েটিও নেই,

শহুরে সেই মাগিটাও নেই,

হুমকি দেওয়া বাঞ্চুতরাও নেই।

 

সবাই কোথাও না কোথাও

নিজ নিজ জীবনে পৌঁছে গেছে।

 

শুধু আমি

আমার জীবন থেকে

কোথাও যেতে পারিনি।

 

আমি এখনও দাঁড়িয়ে আছি

আমার পুরোনো সম্পর্কগুলোর

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে—

 

প্রত্যেককে গালি দিতে দিতে

প্রত্যেকের কাছে

নিজেরই একটা করে অপরাধ রেখে এসেছি।

 

তাই আজকাল

গালাগালির অভিধান খুললে

সব শব্দই আমার দিকে ফিরে আসে।

 

সেখানে দেখি—

একজন শুয়োর,

একজন সিনাল,

একজন ভুস্কি,

একজন আবাল,

একজন শহুরে মাগির পরিত্যক্ত প্রেমিক।

 

অসংখ্য বাঞ্চুতদের হুমকির নিচে

দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুত্তা আর সেটা আমি।

জীবনের সবচেয়ে নোংরা গালিটি হয়তো

 

আমার নিজের জন্যই কেউ জমা করে রেখেছে।


শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন